
2026-05-09 | Viral , মালদা,পশ্চিমবঙ্গ,শিরোনাম,মাধ্যামিক ,, | Kaliachak Sangbad | Views : 362
দিনমজুরের ছেলে মাধ্যমিকে রাজ্যে দ্বিতীয়, কালিয়াচকের সাকিলে গর্বিত মালদহ দারিদ্র্যকে হার মানিয়ে ৭৮০ নম্বর পেয়ে নজির কুশাবাড়ীর কৃতি ছাত্র মোহাম্মদ সাকিল হোসেনের মালদহ জেলার কালিয়াচক যেন আবারও প্রমাণ করল—স্বপ্ন দেখার জন্য ধন-সম্পদের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন শুধু কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় আর ইচ্ছাশক্তি। অভাব-অনটনের সংসার, মাথার উপর দারিদ্র্যের চাপ, তবুও সেই সমস্ত প্রতিকূলতাকে পিছনে ফেলে মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করল কালিয়াচক থানার জামিরঘাটার কুশাবাড়ী গ্রামের কৃতি ছাত্র মোহাম্মদ সাকিল হোসেন। তার প্রাপ্ত নম্বর ৭৮০। এই অসাধারণ সাফল্যে শুধু পরিবার নয়, আনন্দে আত্মহারা গোটা মালদহ জেলা। সাধারণ একটি পরিবারের ছেলে সাকিল। বাবা মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন একজন দিনমজুর। প্রতিদিন পরিশ্রম করে যা রোজগার করেন, তা দিয়েই চলে সংসার। কখনও কাজ থাকে, কখনও থাকে না। তবুও সংসারের অভাব যেন ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ইচ্ছেকে থামাতে পারেনি। মা সাবিনা খাতুন গৃহবধূ। সংসারের সমস্ত দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনার প্রতি সবসময় নজর রেখেছেন তিনি। চার ভাইবোনের পরিবার। দুই ভাই ও দুই বোন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, চারজনই অত্যন্ত মেধাবী। পরিবারের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হলেও পড়াশোনার ক্ষেত্রে কখনও আপস করেননি তাঁরা। এলাকার মানুষও বলেন, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি আলাদা আগ্রহ ছিল সাকিলদের। স্কুলের শিক্ষক থেকে প্রতিবেশী—সকলেই জানতেন এই পরিবারে শিক্ষার প্রতি গভীর ভালোবাসা রয়েছে। সাকিলের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে বহু রাত জেগে পড়াশোনা, কঠোর পরিশ্রম এবং পরিবারের আত্মত্যাগ। গ্রামের একটি সাধারণ বাড়িতে বসেই সে রাজ্যের অন্যতম সেরা ফল করেছে। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকলেও নিজের লক্ষ্য থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরে যায়নি সাকিল। তবে এই পরিবারের সাফল্যের ইতিহাস আজকের নয়। এর আগেও ২০২৩ সালে রাজ্যজুড়ে আলোচনায় এসেছিল এই পরিবার। সাকিলের বড় ভাই মুক্তাদুর রহমান সেই বছর মাদ্রাসা বোর্ডের মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন। সেই সময়ও পরিবারকে নিয়ে সংবাদমাধ্যমে চর্চা হয়েছিল। আর এবার ছোট ভাই সাকিল রাজ্যে দ্বিতীয় হয়ে যেন সেই গৌরব আরও একধাপ বাড়িয়ে দিল। একই পরিবারের দুই ছেলের এমন সাফল্য এলাকায় কার্যত নজির তৈরি করেছে। প্রতিবেশীরা বলছেন, “এই পরিবারটা খুব কষ্টের মধ্যে থেকেও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করিয়েছে। ওদের সাফল্য আমাদের গ্রামের গর্ব।” সাফল্যের খবর প্রকাশ্যে আসতেই কুশাবাড়ী গ্রামে শুরু হয় আনন্দের পরিবেশ। প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন সাকিলদের বাড়িতে। কেউ মিষ্টি নিয়ে আসেন, কেউ ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। ছোট্ট গ্রামের সাধারণ বাড়িটাই যেন মুহূর্তে উৎসবের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। মাধ্যমিকের ফল প্রকাশের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আবেগাপ্লুত মা সাবিনা খাতুন বলেন, “আমরা খুব সাধারণ মানুষ। অনেক কষ্ট করে সংসার চালাই। তবুও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হতে দিইনি। বড় ছেলে ২০২৩ সালে রাজ্যে তৃতীয় হয়েছিল। এবার ছোট ছেলে দ্বিতীয় হয়েছে। আল্লাহর কাছে অনেক শুকরিয়া। সরকার যদি মেধার ভিত্তিতে স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে ওদের ভবিষ্যৎ আরও ভালো হবে।” কথা বলতে গিয়েই বারবার চোখে জল চলে আসে তাঁর। কারণ, এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে অসংখ্য ত্যাগ, না-পাওয়ার গল্প, আর প্রতিদিনের সংগ্রাম। বাবা মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেনও ছেলের সাফল্যে ভীষণ খুশি। তিনি বলেন, “আমি দিনমজুরের কাজ করি। অনেক সময় ঠিকমতো কাজও পাই না। কিন্তু ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা যাতে বন্ধ না হয়, সেই চেষ্টা করেছি। ওরা নিজের চেষ্টায় এত ভালো ফল করেছে। এখন চাই সরকার ওদের পাশে দাঁড়াক।” সাকিল জানিয়েছে, ভবিষ্যতে সে ডাক্তার হতে চায়। ছোট থেকেই মানুষের সেবা করার স্বপ্ন দেখে সে। আর সেই স্বপ্ন পূরণের জন্যই আরও বেশি পরিশ্রম করতে চায়। তবে উচ্চশিক্ষার জন্য আর্থিক সাহায্যের প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানিয়েছে পরিবার। স্কুলের শিক্ষকরাও সাকিলের সাফল্যে অত্যন্ত খুশি। এক শিক্ষক বলেন, “সাকিল অত্যন্ত পরিশ্রমী ছাত্র। পড়াশোনার প্রতি ওর আগ্রহ শুরু থেকেই ছিল। ও শুধু নিজের পরিবারের নয়, গোটা জেলার গর্ব।” এলাকাবাসীরাও সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, এমন মেধাবী ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। কারণ অর্থের অভাবে যাতে কোনও স্বপ্ন থেমে না যায়, সেটাই চান সকলে। বর্তমান সময়ে যখন অনেক ছাত্রছাত্রী নানা সুযোগ-সুবিধা পেয়েও পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলে, সেখানে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে সাকিলের এই সাফল্য সত্যিই অনুপ্রেরণার। তার জীবনকাহিনি প্রমাণ করে, ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রম থাকলে কোনও বাধাই বড় নয়। কালিয়াচকের মতো প্রত্যন্ত এলাকার একটি সাধারণ পরিবার আজ গোটা রাজ্যের কাছে উদাহরণ হয়ে উঠেছে। সাকিল শুধু একটি পরীক্ষায় ভালো ফল করেনি, সে সমাজকে একটি বড় বার্তাও দিয়েছে—অভাব কখনও স্বপ্নকে থামাতে পারে না। আজ কুশাবাড়ী গ্রামের মানুষ গর্ব করে বলছেন, “ও আমাদের গ্রামের ছেলে।” আর সেই গর্বের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক দিনমজুর বাবার ঘাম, এক মায়ের ত্যাগ, আর এক মেধাবী ছাত্রের নিরলস পরিশ্রমের গল্প। মোহাম্মদ সাকিল হোসেনের এই সাফল্য আগামী দিনের অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। দারিদ্র্যের অন্ধকার ভেদ করে শিক্ষার আলোয় যে জীবন বদলে যেতে পারে, সাকিল তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।